DEHLIJ

অমল বসু

এক হুদুর খোঁজে 

 


সংখ্যা এক গতিশীল অভিমুখ। নিয়ত বদলে যায় মহাসড়কের মাইলফলক। নিকটবর্তী হয়ে ওঠে গন্তব্য। টিপ দিয়েছিল চাঁদ, আদরের কোল ছেড়ে মাটিরটানে হামাগুড়ি, উলঙ্গ শৈশব। কালোস্লেটে মক্সকরা সাদা অক্ষর সব মুছে গেছে। ছাতার আদলে বিশাল সে বেলগাছ ঘিরে অভিসন্দি ভাঁজে দুপুরের দুষ্টুরোদ। পূব পশ্চিমে খাঁড়ি, কড়োইতলায় পাড়া শেষ, দূরে নিষিদ্ধ চাঁদমারির ঢিবি।ইজারে গিঁট কষে দৌড়- দক্ষিণে তেপান্তরের মাঠে ঘাটকালীর সাঁকো, উত্তরে কামিনী মহান্তর আমবাগান, বাঁশঝাড়ে খ্যাঁকশেয়ালের হাজারদুয়ারি।     

একসন্ধ্যায় বেলগাছের নীচে বাস্তুহারাদের বৈঠক- পাড়ার একটা নাম না হলেই নয়। মিরারমাঠ বা ম্যারারমাঠ শুনে শুনে নিজেদের চারপেয়ে মনে হয়! নিতাইকাকা নতুন হ্যাজাক ঝুলিয়ে দিলে আলোয় আলোময় গাছতলা। অবাক আলোর খুশিতে বাচ্চারা তাল বুঝে মাঠে নেমে বেতাল। সুধীরকাকা, যতীনকাকা, কান্তিমামা, যামিনীকাকা, বাবা, ননীকাকু কার্তিককাকা, কালীকাকা, খগেন সাহা, হেরম্বকাকুদের সাথে হাজির কামিনী মহান্তও।

ফেলে আসা ভিটেমাটির স্মৃতি আঁকড়ে যে যার মতো প্রস্তাব রাখে- নওগাঁ, বগুড়া, পাবনা বা ঢাকার সাথে কলোনি জুড়ে শান্তি পেতে চায়। নানান ঘাটের মানুষ, হঠাৎ এক ঠাঁইয়ে শামিল হওয়া- সোজাকথা নয়। সুধীরকাকা বলেন, নাম হোক বেলতলা, এই বেলগাছ আমাদের নতুন ঠিকানা । বাবা বললেন, ঠিকতাই, সাথে পার্ক জুড়ে, নাম হোক বেলতলাপার্ক। এক স্বরে সায় দিয়ে সবাই বলে ওঠে, বেলতলাপার্ক। বেতাল শিশুরা গলা মিলিয়ে দিলে খাঁড়ি পার হয়ে যায় সে আওয়াজ শহরময়। 

মজার দিনগুলো পোষমেনে আপন হয়ে থাকে না, বই-খাতা বগলে অনিচ্ছুক পায়ে পাড়ার ক্ষুদে দাদাদের সাথে স্কুলে। তিন পিরিয়ডে অক্ষয় স্যার, নামতা মুখস্ত রাখা সহজ নয়। কান ধরে দাঁড় করিয়ে দিলেও, ঢং ঢং টিফিনের ঘণ্টা বেজে ওঠে। একছুটে গেটের বাইরে। আড়াআড়ি পায়ার টেবিল সাজিয়ে নিমাইদা। কাচের বয়মে ছোলা, বাদাম, চিড়ে ভাজা, বাঁশেরঝুড়িতে সেদ্দমটর। সোনারজলে চোবান চৌকো দু-পয়সা এগিয়ে দিলে ঠকাঠক পাঁচমিশালির ঠোঙা। দূরে দাঁড়িয়ে সেদিকে তাকিয়ে ঢোক গিললেও সুখ।  

জলবন্দি বর্ষার দু-মাসে স্কুলে ছুটি নেই, বাঁশেরলগি ঠেলে নৌকা চলে। তুড়িপাড়ার ভুট্টাখেত ছুঁয়ে ঘোষপাড়ার কাঁঠালতলায় লাফ, সোজা স্কুল। সুবোধ বালকেরা ফেরার পথে হোস্টেলের জামরুলগাছে হামলা চালায়। দ্রুতপায়ে হেডস্যারের বাড়ি পার। নাট্যমন্দির তখন কল্যাণী সিনেমা হল, পানবিড়ি চা ও চপের দোকান। ড্রাম বাজিয়ে ভুরু নাচিয়ে সিনেমার প্রচার সেরে হলে ফিরত কিম্ভুত চেহারার ঠসাকাকা। রাস্তায় নেচেকুঁদে ছোটদের ভয় দেখাত খুব। সামনে পড়ে গেলে দৌড়, সোজা ডাকবাংলোপাড়া, দারোগাবাড়ি। খালি পায়ে ধুলো উড়িয়ে হেঁটে যায় তিন নাবালক। বড়ো কেউ কানমুলে দিলে, অবাক তাকাই, দোষের হলটা কী!  

ক্লাস ফোরে মা চাকরিতে চলে গেল, আমি আর ছোট বোন ঘরে। দিনে টোটোকোম্পানি, রাতে লণ্ঠনের আলোয় বইখাতা ও বাবা। ভাতের ফ্যান গালি, ডাল তরকারি, ছিপে ধরা চ্যালা পুঁটি ভাজা, গরুর খড় কাটি, দুধের বালতি হাতে বাজারের বটতলা। দিনে দিনে সিং গজায়, আলগা বাঁধনে বাছুর বেড়া ভাঙে, খায় দায়, আনন্দের নাওবায়।     

ক্লাস ফাইভ, হাফবেঞ্চ ছেড়ে হাইবেঞ্চ, বহর বেড়ে যায় বইখাতার। প্রথম ক্লাসে ফটিকস্যার, হাঁক দিলেন, মাঠু, সামনে এসে বস। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, কে আবার মাঠু! কাকে ডাকছেন ফটিক স্যার। মেরারমাঠে বাড়ি, মাঠের ছেলে মাঠু। বল, মাই নেইম ইজ মাঠু।    হো হো শব্দে হেসে উঠল চারদেয়াল। নস্যি নাকে গুঁজে স্যার চলে গেলেও নামটা সেঁটে গেল পিঠে। রাস্তায় দেখা হলে আজো মাঠু নামেই ডাকে সতীর্থ বিশ্বনাথ। ফটিকস্যার ক্লাসের সবাইকে নিয়ে, ডাঙা ফরেস্টে পিকনিকে এলেন। সেই প্রথম পংতি ভোজনে,  কলাপাতায় মাংস-ভাত, অমলিন সে স্বাদ ও দৃশ্য। শুধু তিনু আসেনি, ফটিকস্যার রাস্তার দিকে চেয়ে থেকে থেকে হতাশ। ফিরতি পথে 

2

দেখি, বড়ো রাস্তায় হাফ প্যাডেলে সাইকেলে ঝুলছে তিনু। তিনু তিনু সবাই চেঁচিয়ে উঠি, সাইকেল ঘুড়িয়ে সে দ্রুত পিঠটান দিল। পিকনিকে কেন আসেনি, এখন কেন এসে ছিল, কেন ফিরে গেল! প্রশ্নের উত্তর মনে নেই, তিনুর কি আর মনে আছে, এতকাল পরে! 

ক্লাস সেভেনে নতুন স্যার শ্রী সুধীর চন্দ্র রায়, হাতে ইতিহাস বই। নাম ডেকে ডেকে মনের খাতায় টুকে রাখছেন দুষ্টু-মিস্টি মুখগুলি। অমল-ধবল, স্যার মুখ তুলে তাকিয়েই আছেন, নীরব ক্লাসরুম। স্যার আবার নাম ডাকেন, অমল-ধবল। পিঠে দাক্কা খেয়ে উঠে দাঁড়াই। তুমিই অমল-ধবল! না স্যার আমি মাঠু। শ্যামল ধাক্কা দিল স্যার। সমবেত হাসির লহরায় চাপা পড়ে যায় ক্রুদ্ধ প্রতিবাদীর ক্ষীণকণ্ঠ। স্যার রথতলার রাস্তায় লাঠিহাতে মন্থর পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন। সামনে দাঁড়ালে মুখ তুলে দেখেন, নিচু হয়ে তাঁর পা ছুঁতেই

কাঁধে হাত রেখে সেই উচ্চারণ, স্যার আর নেই, ধবল ৭৫ পার।   

বিপদ এলো নাইনে উঠে, ছাড়াবাছুর আর ছেড়ে রাখা যায় না। একে পাঠাও দাদার কাছে। মানিকচকের বাসে বসিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে বাবা বলেন, ভয় পাসনে। কিছু খেয়েনিস তিনপাহাড়ে, বেডিং-বাক্স দেখে রাখিস, ঘুমবি না রাতে। নতুন জায়গা, বুদ্ধি দিয়েই সব জিতে নিতে হবে, দাদার কথা শুনিস। বাস ছাড়ল, কালোমেঘ দেখি বাবার মুখে, আমার চোখে ক-ফোঁটা বৃষ্টি। স্টিমারে গঙ্গা পার, রাজমহল, তিনপাহাড়, গয়া প্যাসেঞ্জারে রাত কাবার। নতুন সকালে পৌঁছে গেলাম বেলঘরিয়া। তারপরে আগরপাড়া, তারাপুকুরের মেস। আজ ভাবতে গেলে শিউড়ে উঠি, কতোই না সহজ সরল ছিল সেই সব দিন! 

পাঁচ নম্বর রেলগেট, দীপ্তি হ্যারিকেন ফ্যাক্টারি, সাহেব বাগান, ডাকব্যাক ফ্যাক্টারর। নীলগঞ্জ রোডে আগরপাড়া মহাজাতি বিদ্যাপীঠে নাইনে দাখিল। বঙ্গলক্ষ্মী কটনমিল, বিটি রোড, বেঙ্গল ক্যামিক্যাল, টেক্সম্যাকো, বিড়লা স্টিল, রেল স্টেশনের ব্যস্ততা, ঘণ্টায় ঘন্টায় কারখানার ভোঁ-বাজছে। এ কোথায় এলাম! এই কোলকাতার শহরতলিতে কিচ্ছু ভালো লাগে না। 

চোখে খাঁড়ির চলন, তেপান্তরের মাঠ ডাকে, ফিরে আয়। ঝড়ের পিঠে আম কুড়নো, দুপুরে নিরিবিলি ঘাট থেকে উধাও ডিঙি।  

হরিলুটের বাতাসায় মেঠো কোলাহল। মধ্যপাড়ায় রামরসায়নের সন্ধে। মহন্তপাড়ায় কেষ্টযাত্রা। বিকেলে বাড়ি এসে পরদিন সকালে কপালে চুমু দিয়ে চলে যেত মা। পাঁচ বছর মায়ের কাছে ঘুমোইনি, মুখ মুছিনি আঁচলে। টাঙন যেখানে মহানন্দায়, সেই মোহনায় পাশে বোনকে নিয়ে আছে মা। তিনপাহাড় রাজমহল মানিকচক হয়ে কত দূর সে নদীর মোহনা!  

ঝড় উঠলে মেঘডাকে, বাজপড়ে, টিনওড়ে, ভাঙেগাছ ঘরবাড়ি। বুকের মাঝেও ঝড়। সিটি বাজিয়ে পাকিস্থানের সবুজ রঙের ট্রেন রোজ পার হয়ে যায় পাঁচনম্বর রেলগেট। এই রেলগাড়ি চড়ে যাওয়া যেতে পারে নজিপুর, পত্নীতলা! তিনপাহাড়ে যায় গয়া প্যাসেঞ্জার, কখন সে ট্রেন ফেরে বেলঘরিয়ায়! সহজ প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত জানে ৫ নম্বর রেল গেটের নীল জামা।

ভোঁ ভোঁ শব্দে জ্বলছে মেসবাড়ির প্রাইমারস্টোভ, ডালপোড়ার কটুগন্ধ। সে গন্ধ আপ গয়া প্যাসেনজারের কামড়ায়। ঝিমমেরে বসে আছে দিনাজপুরের এক হুদু। তিনপাহাড়, রাজমহঘাট, গঙ্গাপার হয়ে বালির চর ভেঙে দৌড়। পাড়ে দাঁড়িয়ে বালুরঘাটের বাস। 

আত্রাই নদীর আঙুল ছুঁয়ে শুয়ে আছে আজন্মের সাথী ডাঙ্গাখাঁড়ি। আটচালা ছনের বাড়িটা একা। শূন্য বেদীতে নেই তুলসীর ছায়া। মানুষের পা পড়েনি বহু দিন, সময়ের ভারে খানিক হেলে আছে। উঠোনে খেয়াল খুশির আগাছা, বেলের ছায়ায় শরীর জুড়ে কান্না 

মা-র আঁচল শেষ আশ্রয়। টাঙনের পাড়ে বুকে মাথা রেখে মোহনায় লীন।    

আজ পঁচাত্তরের পাড়ে, কর গুনে খুঁজে যাই স্কুলের বন্ধুদের। নব, তিনু, সুরিজিত, হরিপদ, বিশ্বনাথ, দীপেশ, অশোক, প্রদীপ্ত, বিমল, প্রবীর। কলেজের দেবাশিস, সরোজ, অঞ্জন। আর সব কোথায় হারিয়ে গেছে! ভেজা চোখে মুখ তুলে তাকালে, নব দাস চেয়ারে সোজা হয়ে বসে। ঘনিষ্ট ভঙ্গিতে বলে, হিলি-তুরা করিডোর ধরে বন্ধুদের বেড়াতে নিয়ে যাব মেঘালয়। তিনুর আড্ডায় পোস্টার সেঁটে দিস, আর ফেসবুকে জুতসই পোস্ট। ট্যাগ করে রাখিস তিন ভুবনের বন্ধুদের নামে।  



No comments

FACEBOOK COMMENT